২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং পূর্ববর্তী সরকারের দুর্নীতি, অনিয়মের চিত্র এবার পাঠ্যপুস্তকে জায়গা পেয়েছে। নতুন পাঠ্যবইয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চালু হওয়া, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ, এবং ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠার ঘটনাও সংক্ষিপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে এছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণজাগরণ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের ছাত্র-অভ্যুত্থান, এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
৬ষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে নতুন অধ্যায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ নামে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্য শ্রেণির বইয়ের কনটেন্টেও কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন হচ্ছে, যা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে।
এনসিটিবির শিক্ষা ও সম্পাদনা শাখার প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানিয়েছেন, মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ের কনটেন্টে পরিবর্তন আসছে, এবং পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও বিভিন্ন শাসকের কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে। এরপর বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি শুরু হয়। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন বাতিল হয়। পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঘটনাবলি প্রকাশ করা হয়েছে, যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করে।
পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ আছে, শেখ হাসিনার শাসনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংসাত্মক। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার দুর্নীতি ও সম্পদ পাচারের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে একটি কমিশন গঠন করে। রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।
পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন, ১৯৯০ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরকারি চাকরিতে কোটা নীতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। পুলিশের সহিংসতার মধ্যেও আন্দোলন বীরত্বের সঙ্গে এগিয়ে যায়। বহু শিক্ষার্থী শহীদ হন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে গণ-আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
পাঠ্যবইয়ে গ্রাফিতি বা দেওয়ালচিত্রের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সচেতনতা, জাতীয় ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ ও ইনসাফ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের ফলে জনগণ ভবিষ্যতের সরকারকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করবে। শিক্ষার্থীদের এই ইতিহাস পাঠে ন্যায্যতার জন্য সংগ্রামের গুরুত্ব এবং নিপীড়ক শাসক পরাজয়ের অমোঘতা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, এবং জনগণের অধিকার সচেতনতা সম্পর্কে গভীর ধারণা দেবে। ইতিহাসের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, বইটি প্রমাণ করে যে নিপীড়ক শাসক যতই শক্তিশালী হোক, ন্যায় ও গণপ্রতিরোধের শক্তি চিরকাল অজেয়। নতুন অধ্যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, দায়িত্ববোধ এবং সমাজে সক্রিয় ভূমিকার গুরুত্ব সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
