দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা প্রায় তিন যুগ পূর্ণ করেছে। উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা। তবে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে গবেষণায় অর্থ বরাদ্দের কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এই খাতে নিশ্চুপ। ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে এক টাকাও ব্যয় করেনি, ফলে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন ওঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ ৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮৭০ টাকা গবেষণায় ব্যয় করেছে। এর বিপরীতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নামমাত্র অর্থ খরচ করেছে, যেমন: বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (বাইউস্ট) মাত্র ৫ হাজার টাকা, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ২১ হাজার টাকা, এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চট্টগ্রাম ৪০ হাজার টাকা।
বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় মোট ব্যয় ছিল ১৬৬ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার টাকা, যার গড় ২ কোটি ১০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। ৮১টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় কিছু না কিছু ব্যয় করেছে। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় ব্যয় করেছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে, তবু মোট ও গড় ব্যয় বেড়েছে, ২০২২ সালে মোট ব্যয় ছিল ১৩৯ কোটি ৩১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, গড় ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
ইউজিসি জানাচ্ছে, ২০২৩ সালে গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও অর্থ বরাদ্দ শুরু করতে পারেনি, তবে ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ আশা করা যাচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণার কাজে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক। কমিশন আশা করে, ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিতভাবে গবেষণা কার্যক্রমে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় করবে।
গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়
দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আশা ইউনিভার্সিটি, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইউনিভার্সিটি, জেড এইচ সিকদার বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সৈয়দপুর, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি, জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি, আহ্ছানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা খান বাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি রাজশাহী, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি, মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আরটিএম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
কেন ২৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় কোনো টাকা ব্যয় করেনি?
বিভিন্ন কারণে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নতুন হওয়া, অর্থের সীমাবদ্ধতা, বা বাজেট পরিকল্পনার অভাবের কারণে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে পারেনি।
কোন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি?
দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ সহ মোট ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এ তালিকায় রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় আইনে গবেষণায় অর্থ বরাদ্দ বাধ্যতামূলক কি?
হ্যাঁ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের বার্ষিক বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণার জন্য ব্যয় করতে হবে।
গবেষণায় কম ব্যয়ের ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
গবেষণায় বিনিয়োগ না হলে শিক্ষার্থীরা প্রায়োগিক ও গবেষণামূলক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়, যা উচ্চশিক্ষার মানে প্রভাব ফেলতে পারে।
কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালে গবেষণায় অর্থ ব্যয় করেছে?
২০২৩ সালে ৮১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় কোনো না কোনো পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে।
গবেষণায় সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় কোন বিশ্ববিদ্যালয় করেছে?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮৭০ টাকা গবেষণায় ব্যয় করেছে।
গবেষণার মোট এবং গড় ব্যয় কত?
২০২৩ সালে গবেষণায় মোট ব্যয় ছিল ১৬৬ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার টাকা, গড় ব্যয় প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২ কোটি ১০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
উপসংহার
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসলেও গবেষণার জন্য বরাদ্দ এবং ব্যয়ের অভাব উদ্বেগজনক। ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় না করায় শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত জ্ঞান ও গবেষণামূলক দক্ষতার ওপর প্রশ্ন উঠেছে। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথভাবে গবেষণায় অর্থ ব্যয় করছে, যা ইতিবাচক দিক। ইউজিসি আশা করছে, ভবিষ্যতে সকল বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিতভাবে গবেষণায় প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করবে, যাতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
