সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে। এর অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরে সুদহার আরও কমানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রেক্ষিতে আগামী ডিসেম্বরে নতুন সুদহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমিয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু বাড়াচ্ছে। কারণ, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার সঞ্চয়পত্রের তুলনায় কম। এতে সরকার আর্থিকভাবে লাভবান হলেও, সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষ, বিশেষ করে অবসরে থাকা নাগরিকরা, সমস্যার মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমছে। তার পরও সুদহার কমানো হচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। সরকারের জন্য ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া সস্তা হলেও, সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য এটি চাপ সৃষ্টি করবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মূল স্কিমগুলোর সুদহার ৪৭–৫৭ বেসিস পয়েন্ট কমানো হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১২.৩৭% থেকে কমিয়ে ১১.৮৩%, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১২.৩০% থেকে কমিয়ে ১১.৮২%, পরিবার সঞ্চয়পত্র (৫ বছর) ১২.৫০% থেকে ১১.৯৩% এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র (৫ বছর) ১১.৯৮% করা হয়েছে। এর আগে ২০২১ সাল থেকে কয়েক দফায় সুদহার কমানো ও কড়াকড়ি শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে। এতে বয়স্ক, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে তারা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে।”
সঞ্চয়পত্রে নিরাপদ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিয়েছে। গত জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদহার কমিয়ে সর্বোচ্চ ১১.৯৮% করা হয়েছে, যা আগামী জানুয়ারিতে ১০% এর কাছাকাছি নামানো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসির নির্বাহী পরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, “বেসরকারি বিনিয়োগ কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত টাকা রয়েছে। তারা সরকারী ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনছে, যেখানে সুদহার প্রায় ৯.৫%–৯.৯%, যা সঞ্চয়পত্রের চেয়ে কম। এভাবে সরকার সস্তায় ঋণ নিচ্ছে।”
সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ক্রমেই কমছে। জুলাই মাসে নিট বিক্রি ১,২৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই মাসের ২,১৮৭ কোটি টাকার তুলনায় ৪১% কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “সরকার চায় মানুষ সঞ্চয়পত্রের বদলে ট্রেজারি বন্ড ও বিলের দিকে বিনিয়োগ করুন। বিকল্প বিনিয়োগ উৎস থাকায় সঞ্চয়পত্রে ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার যথাক্রমে: ৯১ দিন ৯.৫০%, ১৮২ দিন ৯.৭১%, ৩৬৪ দিন ৯.৬০%, ২ বছর ৯.৪৪%, ১০ বছর ৯.৯০%, ১৫ বছর ৯.৬৬% এবং ২০ বছর ৯.৭০%। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক খাত থেকে নেট ঋণ কমেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
সঞ্চয়পত্রের সুদহার কেন কমানো হচ্ছে?
সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সস্তায় ঋণ নেওয়ার কারণে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমাচ্ছে। এতে সরকারি খরচ কমে।
সুদহার কমানো হলে বিনিয়োগকারীদের কী প্রভাব পড়বে?
বয়স্ক এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
আগামী কতদিনে নতুন সুদহার ঘোষণা হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ডিসেম্বরে নতুন সুদহার ঘোষণা করবে।
সরকার কেন সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমাচ্ছে?
সরকার চাইছে মানুষ সঞ্চয়পত্রের বদলে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করুক, কারণ এতে সরকার সস্তা ঋণ নিতে পারে।
বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার কত?
বর্তমানে সর্বোচ্চ সুদহার ১১.৯৮%।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরাপদ কি না?
সঞ্চয়পত্র এখনও নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম, তবে সুদহার কমায় আকর্ষণ কমেছে।
পূর্বের কেনা সঞ্চয়পত্রের সুদ কেমন থাকবে?
আগের সঞ্চয়পত্রের সুদ মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত হারে থাকবে।
উপসংহার
সরকারের সঞ্চয়পত্র থেকে ধীরে সরে আসা এবং সুদহার কমানোর উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক হলেও, এর প্রভাব পড়ছে বয়স্ক ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর, যারা সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীল। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার সস্তায় ঋণ নিতে পারছে, কিন্তু সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়ছে।
