শিশু শিক্ষা শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে শিশুদের অবৈতনিক ও সমান সুযোগভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও বৈষম্য ও অনিয়মের চক্রে আটকে আছে। দেশের অনেক বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করলেও, অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করা শিক্ষা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না।
শিশু শিক্ষার বৈচিত্র্য ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে নানা ধরনের শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে—এবতেদায়ী, কিন্ডারগার্টেন, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়। তবে শুধুমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিশু শিক্ষা প্রশিক্ষণ রয়েছে। বেসরকারি বা অন্যান্য শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায়শই প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল, যা শিশুদের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
উচ্চশিক্ষিত মেধাবী শিক্ষক থাকলেও, শিশু শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকরা মেধা বিকাশে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন না। এটি অনেকটা হাতুড়ে চিকিৎসকের চিকিৎসার মতো। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়েও শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মনোভাবের অধীনে চলছে।
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের গুরুত্ব
শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকের শিক্ষাদান জাতির মেধা বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষা আইন অনুসারে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবৈতনিক শিক্ষা ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যাও সীমিত, আর বেসরকারি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই অতিরিক্ত বই ও মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল, যা মেধা বিনাশের কারণ।
অভিন্ন মূল্যায়ন ও শিশুবান্ধব সময়সূচি
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের জন্য একই অভিন্ন পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। শিশুবান্ধব সময়সূচি, যেমন: স্কুল কার্যক্রম দুপুর ২টার আগে শেষ করা, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই সময়সূচি মেনে চলে না, ফলে শিশুরা দুপুরে খাবার, বিশ্রাম, খেলাধুলা ও পরিবারের কাজে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হয়।
সমন্বিত নীতি ও বৈষম্যহীন শিক্ষা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ রয়েছে। এই চাপ সমস্ত শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমভাবে বিতরণ করা সম্ভব। এছাড়া, সমস্ত শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, অভিন্ন পাঠ্যক্রম, অভিন্ন পরীক্ষা ও মূল্যায়ন নীতি অনুসরণ করতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
- মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা বন্ধ করা এবং কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোকে রেজিস্ট্রেশন ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা।
- শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যাতে শিশুরা শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যথাযথ সহায়তা পায়।
- সকল শিশুর জন্য অভিন্ন সময়সূচি, পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
- মেধাবৃত্তির পরীক্ষা প্রকৃত দক্ষতা যাচাইমুখী হওয়া উচিত, যাতে ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য মেধা বিকৃত না হয়।
অবশেষে, আগে বৈষম্যহীন শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, তারপর সর্বজনীন মেধাবৃত্তি। সকল শিশুর জন্য সমান সুযোগ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের পাঠদান নিশ্চিত করা হলে, প্রজন্মের মেধা বিকাশ সম্ভব হবে।
উপসংহার
বৈষম্যহীন শিশু শিক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। সকল শিশু যেন অবৈতনিক ও সমান সুযোগভিত্তিক শিক্ষা পান, সেটিই রাষ্ট্রের কর্তব্য। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, অভিন্ন পাঠ্যক্রম, শিশুবান্ধব সময়সূচি এবং কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা না হলে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও মেধার বিকাশ ব্যাহত হবে।
