প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা এক জিনিস নয়। কোনো বিষয়ে সত্যিকারের দক্ষতা অর্জন করতে হলে সেই বিষয়ের প্রতি গভীর মনোযোগ, অন্তর্দৃষ্টি এবং আগ্রহ থাকতে হয়। এটি একটি ‘ইন্টারনাল মোটিভেশন’, যা একজন শিক্ষককে তার বিষয় সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানার, বিষয়টি বিশ্লেষণ করার এবং শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করার প্রক্রিয়া চালিত করে। শিক্ষককে বুঝতে হয় শিক্ষার্থীরা কতটা বিষয়টি গ্রহণ করছে, কোথায় তারা দুর্বল, এবং কী ব্যবস্থা নিলে সেই অবস্থার উন্নতি সম্ভব। এ ধরনের গভীর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সাধারণ প্রশিক্ষণে ঘটে না।
প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা
আমাদের সাধারণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ মূলত নতুন তথ্য বা গবেষণার থিউরিটিক্যাল পরিচয় প্রদানেই সীমাবদ্ধ। কিছু আধুনিক প্রশিক্ষণে মাইক্রো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও, তা প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীর প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে মেলেনা। প্রশিক্ষণে অনেক সময় আর্থিক প্রণোদনা বা এক্সটার্নাল মোটিভেশন ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রকৃত দক্ষতা অর্জনের জন্য, এক্সটার্নাল মোটিভেশন প্রয়োজন হয় না; বরং নিজের পেশাগত আগ্রহ থাকলেই যথেষ্ট। এক্সটার্নাল মোটিভেশন থাকলে শিক্ষক প্রকৃত বিষয় থেকে দূরে সরে যান।
ফলে, আমাদের শিক্ষকরা সারাজীবন প্রশিক্ষণ নিলেও প্রকৃত শিক্ষার মানে পরিবর্তন আসে না। সম্প্রতি একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা অনেক, কিন্তু সক্রিয়ভাবে দক্ষ শিক্ষকরা খুবই কম।

গত দুই বছরে বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৮ জন শিক্ষক প্রশিক্ষিত, যা মোট শিক্ষকের ৭১.৮৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের তুলনায় এটি ৫.৮৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তবে শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন গবেষণা জানাচ্ছে, প্রশিক্ষণের সংখ্যা বেড়ে গেলেও প্রশিক্ষণের মান ও শিক্ষক দক্ষতায় প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেছে।
প্রশিক্ষণ বনাম প্রকৃত দক্ষতা
ব্যানবেইসের জরিপে বিএড-এমএড ডিগ্রিধারীদের প্রশিক্ষিত হিসেবে গণনা করা হয়। দেশের ১৪টি সরকারি ও ৯০টি বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ডিগ্রি প্রদান হয়। তবে সার্টিফিকেট ছাড়া অনেক শিক্ষক দেশি-বিদেশি প্রকল্পে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে ‘প্রশিক্ষণের অভাব’ এমন শিক্ষকরা নেই। কিন্তু শিক্ষাদান, পেশাগত দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলা এবং ইনোভেটিভ শিক্ষাদান এখনো উপেক্ষিত।
থিউরি বনাম প্র্যাকটিস
বর্তমান প্রশিক্ষণে শিক্ষকরা তথ্য সমৃদ্ধ হন, কিন্তু তা ক্লাসরুমে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। এটি এমন, যেমন কেউ ক্রিকেট খেলেনি কিন্তু দর্শক হয়ে জীবনভর খেলা দেখেন। শিক্ষকরা সবসময় দর্শকের ভূমিকায় থাকেন, প্রকৃত খেলোয়াড়ের মতো না। প্রশিক্ষণে আর্থিক প্রণোদনা বা এক্সটার্নাল মোটিভেশন থাকায় শিক্ষকরা শিখার চেয়ে কত টাকা পাবেন, কতদিন ক্লাস থেকে বিরতি পাবেন তা দেখে অংশগ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণ ব্যবসার মতো হয়ে গেছে
শিক্ষক প্রশিক্ষণ এখন বড় প্রজেক্ট ও বাজেটের সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষক কতটা শিখেছেন বা ক্লাসে তা প্রয়োগ করেছেন তা নিয়ে সাধারণত কোনো নজরদারি নেই। তবে কিছু ইতিবাচক ব্যবস্থা, যেমন বিকল্প শিক্ষক রাখা, ক্লাস মিস না হওয়া ইত্যাদি, প্রশংসনীয়।
ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণের সফল উদাহরণ
১৯৯৮-৯৯ সালে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে কারিকুলাম পরিবর্তনের সময় এলটিপি (ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচিং ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট) এবং ব্র্যাকের মডিউলার কোর্স কার্যকরী প্রশিক্ষণ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। তখন শিক্ষকরা আবাসিক প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রকৃত CLT পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হন, প্রশিক্ষণকারীরাও প্রকৃত ক্লাসরুমে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে পৌঁছতেন।
বর্তমান বাস্তবতা
সরকারি প্রশিক্ষণে শিক্ষকদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষে কোনো যোগাযোগ থাকে না, ফলে পেশাগত উন্নয়ন সীমিত। ২০২৩ সালে জাইকা’র জরিপে অপর্যাপ্ত ও মানহীন শিক্ষক প্রশিক্ষণকে মাধ্যমিক শিক্ষার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে বিএড ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ থাকায়, অনেক শিক্ষক ডিগ্রির দিকে বেশি গুরুত্ব দেন, দক্ষতা অর্জনের দিকে নয়।
সার্টিফিকেটের প্রাধান্য
বর্তমানে প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ সার্টিফিকেট নির্ভর হয়ে গেছে। সার্টিফিকেট থাকলেই শিক্ষক পদে আবেদন ও উচ্চ স্কেলে পদোন্নতি পান। মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজে পাস এবং সার্টিফিকেট প্রদান করে। ফলে শিক্ষকরা দক্ষতা অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনে মনোনিবেশ করেন।
উপসংহার
শিক্ষক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পেলেও এটি প্রকৃত দক্ষতায় রূপান্তরিত হয় না। দক্ষ শিক্ষক না থাকলে, যেকোনো শিক্ষানীতি বা পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর হবে না। যদি শিক্ষকের প্রকৃত দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয় এবং সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতা গুরুত্ব পায়, তবেই শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত হবে।
