কোনো ঘটনা স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায় তখনই, যখন তা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়—যখন ইতিহাসের নিরপেক্ষতা ও ঘটনার স্থায়িত্ব প্রমাণিত হয়। যেমন পানি দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অমিশ্রণ থেকে মুক্ত হয়, তেমনি ঘটনাও সময়ের প্রবাহে বিকৃতি, পক্ষপাত ও ক্ষণস্থায়ী আবেগ থেকে শুদ্ধ হয়।
রোববার (১৯ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন এই প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে ঘটনার প্রত্যক্ষ চরিত্ররা আর ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারে না; ফলে ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে। এ কারণে, মাত্র এক বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা—যতই তা গুরুত্বপূর্ণ মনে হোক না কেন—শিশু-কিশোরদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা দায়িত্বশীল কাজ নয়।”
অধ্যাপক মামুন আরও বলেন, “একটি দেশের স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রম কেন বারবার পরিবর্তিত হবে সরকারের দলীয় রং অনুসারে? বাংলা মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারগুলো একের পর এক দলীয় প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করছে। এতে নতুন প্রজন্মের চিন্তাশক্তি ও ইতিহাসবোধ বিকৃত হচ্ছে। পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের পরিবর্তে রাজনৈতিক বার্তা প্রজন্মের মনে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্কুলের বইগুলোকে তারা নিজেদের দলীয় লিফলেটে পরিণত করেছিল। ক্লাস সেভেনে “শিক্ষাই দেশকে দারিদ্রমুক্ত করতে পারে – মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা” মতো স্লোগান ছাপানো হয়েছিল। এছাড়া, শেখ হাসিনার মায়ের পরিচয় নোবেলজয়ী মেরি কুড়ির সাথে যুক্ত করা হয় এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে শেখ কামালের জীবনী শিক্ষার নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
“এর ফলে বাংলা মাধ্যমের মূলধারা ধ্বংসের পরিকল্পনাও সংঘটিত হয়েছিল। পরবর্তী সরকার আসার পর পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস আবার পরিবর্তন হয়,” যোগ করেন অধ্যাপক। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইন্টারিম সরকারও নিরপেক্ষ হওয়ার কথা থাকলেও এজেন্ডা থাকলে শিক্ষার স্বচ্ছতা কীভাবে রক্ষা হবে?”
অধ্যাপক মামুনের মতে, পাঠ্যবই কোনো দলের নয়, এটি একটি জাতির সামষ্টিক চেতনার আয়না। সেখানেই স্থান পাওয়া উচিত কেবল সেই ঘটনাগুলোর, যেগুলো সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়েছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
কেন কোনো ঘটনা পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়?
কোনো ঘটনা তখনই পাঠ্যবইয়ে স্থান পায়, যখন তা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং ইতিহাসের নিরপেক্ষতা, গুরুত্ব ও স্থায়িত্ব প্রমাণিত হয়।
পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা স্বাভাবিক?
পাঠ্যবইতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। এটি শিক্ষার্থীদের ইতিহাসবোধ বিকৃত করতে পারে এবং রাজনৈতিক বার্তা প্রজন্মের মনে প্রজ্বলিত করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্ষমতার লিটমাস টেস্ট কী?
এটি বোঝায়, স্কুল ও কলেজের পাঠ্যবই কতটা নিরপেক্ষভাবে সরকারের ইতিহাস ও কার্যক্রম উপস্থাপন করছে। পাঠ্যবই একটি সরকারের রাজনীতিকে প্রজন্মের মনে কতটা প্রভাব ফেলছে তা পরীক্ষার মতো যাচাই করা হয়।
এক বছরের পুরনো ঘটনাকে পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করা কি ঠিক?
অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুনের মতে, এক বছরের পুরনো ঘটনা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা দায়িত্বশীল কাজ নয়, কারণ এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসের পরীক্ষা পেরোতে পারেনি।
কীভাবে পাঠ্যবই রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে যায়?
যদি সরকার নিজের দলীয় লোগো, নেতার ছবি বা স্লোগান পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে এটি শিক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক বার্তা প্রজন্মের মনে ঢোকানোর মাধ্যম হয়ে যায়।
পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের নিরপেক্ষতা কেমন রক্ষা করা যায়?
ইতিহাস নিরপেক্ষ রাখতে, পাঠ্যবইতে সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘটনা এবং প্রমাণিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
অন্য দেশে কি স্কুলের বইয়ে দলীয় প্রচারণা থাকে?
দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে প্রায় কোথাও স্কুলের পাঠ্যবই দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হয় না। মূলত শিক্ষার্থীর ইতিহাস ও চিন্তাশক্তি বিকাশের জন্য এটি নিরপেক্ষ রাখা হয়।
উপসংহার
পাঠ্যবই হলো কোনো জাতির সামষ্টিক চেতনার আয়না, যা শিক্ষার্থীর ইতিহাসবোধ, চিন্তাশক্তি ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে। কিন্তু যখন পাঠ্যবইতে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় প্রচারণা বা নেতার ছবি ও স্লোগান স্থান পায়, তখন এটি শিক্ষার পরিবর্তে রাজনৈতিক বার্তা প্রজন্মের মনে প্রজ্বলিত করার হাতিয়ার হয়ে যায়।
