ছাতক, দোয়ারাবাজার, শান্তিগঞ্জ ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অবস্থিত সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ফসলি হাওর ‘দেখার হাওর’। এই হাওরের একাংশ ভরাট করে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সুবিপ্রবি) ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত স্থানের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ ও বিতর্ক চলছেই।
স্থানীয়দের একদল আশঙ্কা করছেন, হাওরের একাংশ ভরাট হলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষে একদল স্থানীয়, যারা মনে করেন, এটি এলাকার শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সুবিপ্রবির ছাত্ররা দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস চায়। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তাকবিল এইচ এস চৌধুরী বলেন, “ক্যাম্পাস যেখানেই হোক, আমরা দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস চাই।” গণিত বিভাগের আব্দুর রহমান নিসাত মন্তব্য করেন, “দুই পক্ষের কোন্দল যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি না করে, পরিবেশ বিষয়ক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ।”
দেখার হাওর সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক সড়কের পাশে বিস্তৃত। শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস এলাকার ১২৫ একর জলমগ্ন জমি ভরাট করে ক্যাম্পাস স্থাপনের অনুমোদন ২০২৩ সালের ১৩ জুন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রকল্প ব্যয় ২৯৯ কোটি টাকা। বিশ্ববিদ্যালয় আইনে হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা আছে, তবে হাওর ভরাট করে ক্যাম্পাস করার বিষয়ে সরাসরি উল্লেখ নেই।
মতবিভেদ ও বিতর্ক
জেলা শহর থেকে প্রস্তাবিত ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। অভিযোগ আছে, স্থানটি সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের বাড়ির নিকটে নির্বাচিত হয়েছে। সাবেক মন্ত্রী নিজে বলেছেন, “ভালো জায়গা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে হোক।”
হাওর রক্ষাকারী সংগঠন হাউসের নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, “হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় হলে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ধান ও মাছের উৎপাদন কমবে, নদ-নদীর পরিবেশ প্রভাবিত হবে।”
তবে স্থানীয়রা ভিন্নমত পোষণ করছেন। জয়কলস ও ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দারা মনে করছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় সুনামগঞ্জের জন্য আশীর্বাদ, হাওরের ক্ষতি বেশি হবে না।”
আইনজীবী হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী বলেন, “হাওর ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি যেন না হয়, তাই আমরা অন্য এলাকায় ক্যাম্পাস স্থাপনের প্রস্তাবনা দিয়েছি।” শান্তিগঞ্জ ও আশপাশের মানুষ দ্রুত ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা মনে করছেন, হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বড় জায়গা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান এবং সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার স্পষ্ট জানিয়েছেন, হাওর বা জলাশয় ভরাট করে ক্যাম্পাস করা পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম অনুযায়ী সম্ভব নয়। তবে জাতীয় স্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে তা করা যেতে পারে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি নির্ধারণের কাজ ইতিমধ্যেই হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাজ চলমান।”
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
দেখার হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় কেন স্থাপন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে?
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সুবিপ্রবি) দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য জয়কলস এলাকার ১২৫ একর জমি ভরাট করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা কেন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরুদ্ধে?
একদল স্থানীয় মনে করেন, হাওরের একাংশ ভরাট করলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ধান ও মাছের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
স্থানীয়দের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পক্ষে কে কে আছেন?
একদল স্থানীয় মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সুনামগঞ্জ ও আশেপাশের শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং হাওরের ক্ষতি প্রকৃতপক্ষে খুব বেশি হবে না।
ছাত্রদের এই বিষয়ে অবস্থান কী?
সুবিপ্রবির ছাত্ররা দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস চায়। তারা মনে করেন, যেকোনো অবস্থানেই দ্রুত ক্যাম্পাস স্থাপন করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য কত ব্যয় অনুমোদিত হয়েছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের জন্য ২৯৯ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে।
হাওরে ক্যাম্পাস স্থাপনের আইনগত প্রভাব কী?
বিশ্ববিদ্যালয় আইনে দেখার হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা আছে, কিন্তু হাওর ভরাট করে ক্যাম্পাস করার বিষয় সরাসরি উল্লেখ নেই।
ভিন্নমতের কারণে স্থানীয়দের মধ্যে কী ধরণের বিতর্ক চলছে?
জেলা শহর থেকে প্রস্তাবিত ক্যাম্পাস দূরত্ব, সাবেক মন্ত্রীর বাড়ির নিকটে স্থান নির্বাচন, এবং হাওরের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে।
উপসংহার
দেখার হাওরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্থাপনের পরিকল্পনা সুনামগঞ্জের শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি স্থানীয়দের মধ্যে বিতর্ক ও দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কিছু স্থানীয় ও পরিবেশ সংরক্ষণকারী মনে করছেন, হাওরের একাংশ ভরাট করলে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, ধান ও মাছের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে স্থানীয়রা ও ছাত্ররা দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাসের পক্ষে, যেটি শিক্ষার মান উন্নয়ন ও এলাকায় উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করবে।
