প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ অধ্যাদেশ–এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে ঢাকার সরকারি সাত কলেজের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং এসব কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আনা। উদ্দেশ্যটি প্রশংসনীয় হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কতটা যৌক্তিক ও আইনসম্মত, তা খসড়া অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করেই বোঝা যাবে।
ধারা ৩ ও ৬–এর প্রভাব
খসড়া অনুযায়ী সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজ বিলুপ্ত হয়ে সেখানে হবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। কার্যক্রম চলবে দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ওই ক্যাম্পাসগুলোতে কী কার্যক্রম চলবে, তা অধ্যাদেশে পরিষ্কার নয়।
সংবিধান ও আইনগত প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দিয়েছে। তবে এক পক্ষের সম্পত্তি অন্যপক্ষকে হস্তান্তর করার বিষয়ে জটিলতা রয়েছে। এখানে তিন পক্ষ জড়িত— (১) ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি, (২) শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং (৩) কলেজ কর্তৃপক্ষ। সাত কলেজের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আইনসম্মতভাবে হস্তান্তর সম্ভব কিনা—এ নিয়ে আইনজ্ঞদের মতামত জরুরি।
শিক্ষার্থী ভর্তির প্রশ্ন
যদি সাত কলেজ বিলুপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রূপান্তরিত হয়, তবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ভর্তি কীভাবে সম্ভব হবে? তখন শিক্ষার মান উন্নতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে কীভাবে—এ প্রশ্নও থেকে যায়।
লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ
সাতটি সরকারি কলেজে বর্তমানে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী স্বল্প খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এর মধ্যে দুটি কলেজ নারী শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। এসব কলেজ বিলুপ্ত করে মাত্র ১০-১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করা কতটা জনগুরুত্বপূর্ণ তা ভাবনার বিষয়।
আরও পড়ুন: মাউশি অধিদপ্তর কর্মকর্তার মেয়ের কলেজে নিয়োগে জালিয়াতি কেলেঙ্কারি
মূল সমস্যার উৎস
সাত কলেজের শিক্ষাগত সমস্যার মূল কারণ অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যর্থতা। কলেজ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। তাহলে কেন ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলো বিলুপ্ত করা হবে?
মতামত ও প্রস্তাব
ঢাকার সাত সরকারি কলেজের সমস্যার সমাধান হতে পারে একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রশাসনসমৃদ্ধ Collegiate বা Affiliated University গঠনের মাধ্যমে। এজন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের ধারা ৩ ও ৬ সংশোধন করে সাত কলেজ বিলুপ্ত না করে কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা উচিত। এতে—
- শিক্ষার্থীরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাবে
- সার্টিফিকেটে কলেজের নাম অক্ষুণ্ণ থাকবে
- বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস ও গবেষণা কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে
- কারো ক্ষতি হবে না, বরং শিক্ষার মান উন্নত হবে
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ’s)
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য কী?
ঢাকার সরকারি সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করা।
অধ্যাদেশের ধারা ৩ ও ৬ অনুযায়ী কী পরিবর্তন আসবে?
ধারা ৩ ও ৬ অনুযায়ী সাতটি সরকারি কলেজ বিলুপ্ত হয়ে সেগুলো ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে রূপান্তরিত হবে।
এই পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের কী প্রভাব পড়বে?
স্বল্প খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কমে যেতে পারে এবং লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে পারে।
সাত কলেজ কেন বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে?
খসড়া অধ্যাদেশে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্যাম্পাস তৈরি করতে সাত কলেজকে রূপান্তর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সাত কলেজ বিলুপ্ত হলে শিক্ষার মান বাড়বে নাকি কমবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কলেজ বিলুপ্ত করলে শিক্ষার মান উন্নত হবে না বরং সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের মূল সমস্যার উৎস কোথায়?
সমস্যা মূলত অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তৈরি হয়েছে।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা কি আইনগতভাবে সম্ভব?
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩(১) অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব হলেও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরে আইনগত জটিলতা রয়েছে।
উপসংহার
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ খসড়া নিঃসন্দেহে শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি উদ্যোগ, তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে অনেক আইনগত, প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সাতটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজ বিলুপ্ত করার পরিবর্তে এগুলোকে একটি Collegiate বা Affiliated University-এর অধিভুক্ত করা বেশি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। এতে কলেজগুলোর ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকবে, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য পূরণ হবে কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক বা ক্ষতি ছাড়া।
