আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তানদের জন্য মোটামুটি ভালো শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে বলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশি স্কুলে ভর্তি করানো তাদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা সেই সুযোগ পায় না। অনেক অভিভাবকই সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে অক্ষম।
স্বাধীনতার পর থেকে সরকারগুলো গরিব মানুষের শিক্ষার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়নি। নীতিনির্ধারক, মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা সচিবরা সাধারণত নিজেদের সন্তানদের উন্নয়ন নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন। তাই স্বাধীনতার এত বছর পরেও দেশের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা উন্নয়ন সম্ভব হয়নি।
দেশের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে হলে শিক্ষা সুযোগ সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষার আলো সমাজের প্রতিটি ঘরে না ছড়ালে রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়—এ সত্য সরকার এখনো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি।
একটি উদাহরণ দেওয়া যায়: যদি বিশাল এক বিলাসবহুল অট্টালিকার চারপাশে বস্তি, নেশাগ্রস্ত ও অশিক্ষিত মানুষ বসবাস করে, তাহলে সেই অট্টালিকার সৌন্দর্যও মলিন হয়ে যায়। একইভাবে, তৃণমূল জনগণের শিক্ষা ছাড়া কেবল কিছু ধনী পরিবারের শিক্ষা সমাজে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে না।
আমাদের দেশে অনেক গরিব পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য সহায়-সম্পদ বিক্রি করে দেয়, কিন্তু সরকার সে মানসিকতা দেখায় না। বরং সামান্য কিছু করলেও বড় প্রচারণা চালানো হয়।
সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করতে সরকারের বড় ধরনের নাটকীয় প্রচেষ্টা দেখা গেছে। অথচ একই পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। শিক্ষকদের আন্দোলন, লাঞ্ছনা, এমনকি পুলিশের হাতে অপমান—এসব ঘটনার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দুঃখপ্রকাশ বা অনুশোচনা দেখা যায়নি। প্রশ্ন আসে—শিক্ষক কি শত্রু? কেন তাঁদের প্রতি এমন আচরণ?
বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রয়েছেন। তবুও শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়নে তেমন কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। যেন উপদেষ্টা হওয়ার পর তাঁরা ভুলে গেছেন, শিক্ষকই সমাজের শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন।
দেশকে যদি উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে তুলতে হয়, তবে প্রথমেই দরকার তৃণমূল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা। পাশাপাশি, শিক্ষকদের অন্যান্য সরকারি কর্মচারীর সমান বেতন ও মর্যাদা দিতে হবে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানকার শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষিত ও শিশু শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা শিক্ষার্থীর বয়স, রুচি ও মানসিক সক্ষমতা অনুযায়ী পাঠদান করেন, ফলে শিশুর শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে।
অন্যদিকে, অধিকাংশ কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক বিভাগে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। তাদের শিক্ষা পরীক্ষানির্ভর, জ্ঞাননির্ভর নয়। তাই সরকারি বিদ্যালয়ই শিশুশিক্ষায় সবচেয়ে এগিয়ে।
এখন সময় এসেছে এই বিদ্যালয়গুলোকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করার।
অনতিবিলম্বে নতুন নির্মিত প্রায় ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
সাথে সাথে শিক্ষকদের জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ের মর্যাদা, প্রধান শিক্ষকদের নবম গ্রেড এবং সহকারী শিক্ষকদের দশম গ্রেড প্রদান করা জরুরি।
সবশেষে, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা ও মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, জাতীয়করণই পারে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ করতে।
উপসংহার
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও সমতার ওপর। যখন সমাজের একটি শ্রেণি উন্নত শিক্ষার সুযোগ পায় আর অন্য শ্রেণি সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তখন রাষ্ট্রের অগ্রগতি অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সময় এসেছে জাতীয়করণভিত্তিক একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার—যেখানে প্রত্যেক শিশু, তার আর্থিক অবস্থা যাই হোক না কেন, মানসম্মত ও অবৈতনিক শিক্ষা পাবে।
