অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত শিক্ষকদের হাতে প্রায় জিম্মি হয়ে পড়ছেন। এর ফলে পরিবারে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, এবং অনেক অভিভাবক সন্তানদের কোচিং খরচ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সরকার ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা জারি করেছিল, কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ।
নীতিমালার মূল পয়েন্ট
- শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না।
- অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ জনকে পড়ানোর অনুমতি রয়েছে, সেটিও প্রতিষ্ঠানের প্রধানের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে।
- অনেক শিক্ষক এই নিয়মকে অপব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অসম্পূর্ণ রাখছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত কোচিংয়ে আসে।
- রিডও: ফেনীর নুরুন নেওয়াজ হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকের নিয়োগের ঘোষণা
- হোম পেজে যান: dainikshiksha
বাস্তব চিত্র
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিজের কোচিং ক্লাস চালাচ্ছেন। কেউ কেউ নিখুঁত বাসা বা আলাদা কোচিং সেন্টার তৈরি করেছেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোচিং না করলে পরীক্ষায় নম্বর কমানো বা মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে চাপগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষাব্যবস্থা কোচিংনির্ভর হয়ে উঠছে।
পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী:
- মাধ্যমিক শিক্ষকের ৭২% কোনো না কোনোভাবে কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের সঙ্গে জড়িত।
- এর মধ্যে ৫৩% শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছেন, যা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
- ৪৭% শিক্ষক ছুটির পর শ্রেণিকক্ষে কোচিং চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিজ্ঞতা
রাজধানীর একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানিয়েছে:
“স্যার ক্লাসে ভালোভাবে পড়ান না, সরাসরি কোচিংয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। যারা কোচিংয়ে যায় তারা ভালো নম্বর পায়, যারা যায় না তাদের প্রতি আচরণ খারাপ হয়।”
মোহাম্মদপুরের এক অভিভাবক বলেছেন:
“আমার মেয়েকে বাধ্য হয়ে কোচিংতে পাঠাতে হচ্ছে, নইলে ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বাসায় কোচিং হলে ১,০০০–১,৫০০ টাকা দিতে হয়, কিন্তু একা পড়ে পরীক্ষায় ভালো করতে হলে ৫,০০০–৮,০০০ টাকা ব্যয় হতে পারে।
যশোরের কেশবপুরে এমনকি প্রাইভেট কোচিং না করায় হামলার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।
নীতিমালার উদ্দেশ্য ও নিয়ম
- অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য প্রতিটি বিষয় মাসে ১২টি ক্লাস এবং প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী।
- ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের ১০% বিদ্যালয়ের পানি, বিদ্যুৎ ও সহায়ক খরচে ব্যবহৃত হবে।
- দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচ বা সম্পূর্ণ মওকুফ করার বিধান রয়েছে।
তবুও, বাস্তবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা বন্ধ করে কাজের দিকে ঝুঁকছে, যা শিশু শ্রম বৃদ্ধি করছে।
প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
- পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই।
- জেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তা প্রায় ৩০–৫০টি বিদ্যালয়ের দেখাশোনা করেন।
- স্থানীয় প্রভাবশালী শিক্ষক ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে নীতিমালা কার্যকর হচ্ছে না।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম বলেন:
“নীতিমালা থাকলেও প্রয়োগ না হলে কাগুজে নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রশাসনিক শক্তি, নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি।”
শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা মনে করেন, কোচিং নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, নৈতিক প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে কোচিংনির্ভরতা ও সামাজিক বৈষম্য শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
কোচিং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?
অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন কোচিং ছাড়া ভালো ফলাফল পাওয়া কঠিন, কারণ কোচিং ক্লাসে বিষয়গুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া হয়।
ক্লাসরুম ও কোচিং-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
ক্লাসরুমে সাধারণ পাঠদান হয় এবং সময় সীমিত থাকে, কিন্তু কোচিংয়ে ব্যক্তিগত মনোযোগ, প্রশ্নোত্তর, এবং অতিরিক্ত প্রস্তুতি দেওয়া হয়।
কোচিং নীতিমালা কী বলে?
সরকার ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা জারি করেছে। এর মধ্যে শিক্ষকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং দিতে পারবে না, অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতি রয়েছে।
শিক্ষার্থীরা কি বাধ্য হয়ে কোচিং করতে হয়?
কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে অসম্পূর্ণ পড়ান, যাতে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিংয়ে যায়। তবে এটি নীতিমালার লঙ্ঘন এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ।
কোচিং ছাড়া কি শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করতে পারবে?
হ্যাঁ, শিক্ষার্থীরা স্বল্প পরিমাণে নিজের অধ্যবসায়, নিয়মিত ক্লাস ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করে ভালো ফলাফল করতে পারে। কোচিং অতিরিক্ত সহায়ক, বাধ্যতামূলক নয়।
কোচিং কি মানসিক চাপ বাড়ায়?
হ্যাঁ, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার নম্বর কমানোর ভয়ে কোচিংয়ে যোগ দেয়, যা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে।
উপসংহার
কোচিং বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এটি স্বাভাবিক শিক্ষার বিকল্প নয়। শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত কোচিংয়ে মনোনিবেশ করানো, নীতিমালা লঙ্ঘন, এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর।
