চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মুরাদপুরে শিক্ষাবোর্ড কার্যালয়ে দুদকের একটি দল অভিযান শুরু করে।
এই প্রতিবেদনের সময় (দুপুর সাড়ে ১২টা) দুদকের কর্মকর্তারা বোর্ডে অবস্থান করছেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন এবং বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করছেন।
দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগে অভিযান চালানো হচ্ছে। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।”
বোর্ডে জালিয়াতির পুরনো অভিযোগ
এর আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। পরীক্ষায় অংশ না নিলেও শিক্ষার্থীরা জিপিএ-৫ পেয়েছে, পুনঃনিরীক্ষণে খাতার চেয়ে সার্ভারে বেশি নম্বর প্রদর্শিত হয়েছে, এমনকি মেয়ের জায়গায় ছেলে পরীক্ষা দিয়েছে এমন ঘটনা ঘটেছে। বিশেষত বোর্ডের গুদাম থেকে সাড়ে ১০ লাখ খাতা ও লুজ শিট উধাও হওয়া সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
বোর্ড কর্তৃপক্ষ এসব অনিয়মকে প্রায়ই ‘ছোটখাটো ভুল’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তদন্তে নতুন তথ্য মিললেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বাঁশখালীর চাম্বল উচ্চ বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী আইসিটি পরীক্ষা না দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। পরে ১৭ শিক্ষার্থীর ফল বাতিল করা হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনশন
পুনঃনিরীক্ষণে গরমিল
এই বছরের এসএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষণে ১৯ শিক্ষার্থীর ৩৪টি খাতায় গরমিল ধরা পড়ে। খাতার চেয়ে সার্ভারে ১০–২০ নম্বর বেশি দেখানো হয়েছিল। এ ঘটনার কারণে বোর্ডে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
৩ সেপ্টেম্বর বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ আসে, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এক ছাত্রীর নাম পরিবর্তন করে ছেলের নামে প্রবেশপত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী এ অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করেন।
সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি
বোর্ডের খাতা গণনায় বড় অনিয়ম প্রকাশ পায়। ১৬ লাখ ৪৫ হাজার খাতার বদলে পাওয়া গেছে মাত্র ১০ লাখ ৪৭ হাজার, এবং ১২ লাখ ৪৮ হাজার লুজ শিটের বদলে মজুদে আছে সাড়ে ৮ লাখ। অর্থাৎ সাড়ে ১০ লাখ খাতা উধাও।
এর আগে বোর্ড কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফল জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের তৎকালীন সচিব নিজ ছেলের ফল জালিয়াতি করেছিলেন। তিনি বরখাস্ত হন এবং মামলা বিচারাধীন।
বোর্ড চেয়ারম্যানের মন্তব্য
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, “চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের গুদামে কত খাতা মজুদ আছে তা গত ৩০ বছরেও হিসাব করা হয়নি। আমি যোগ দেওয়ার পর একটি কমিটি গঠন করেছি। প্রাথমিকভাবে সাড়ে ১০ লাখ উত্তরপত্র ও লুজ শিট কম থাকার বিষয় পাওয়া গেছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার সময়ের প্রতিটি ঘটনার পৃথক কমিটি করা হচ্ছে। প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে অধিকতর তদন্ত করা হবে। অপরাধী বোর্ডের হলে বোর্ডের আইনে, বাহ্যিক হলে দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাধারণভাবে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
এসএসসি ফল জালিয়াতি কি ঘটেছে?
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষায় অংশ না নেয়া শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়া, খাতার চেয়ে সার্ভারে বেশি নম্বর দেখানো ইত্যাদি ঘটেছে।
অভিযানে কে অংশ নিয়েছে?
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের একটি দল শিক্ষাবোর্ডে অভিযান চালিয়েছে।
অভিযান কখন এবং কোথায় হয়েছে?
রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় মুরাদপুরে শিক্ষাবোর্ড কার্যালয়ে অভিযান শুরু করা হয়।
অভিযানের উদ্দেশ্য কী?
দুদক বোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ খতিয়ে দেখে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নথি পর্যালোচনা করতে এসেছে।
ফলাফল জালিয়াতি কারা করেছে?
কিছু ঘটনা বোর্ডের কর্মকর্তাদের, আর কিছু শিক্ষার্থীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। তদন্ত চলছে।
বোর্ডের খাতা ও লুজ শিটের কী অবস্থা?
বোর্ডের ১৬ লাখ ৪৫ হাজার খাতার মধ্যে মাত্র ১০ লাখ ৪৭ হাজার পাওয়া গেছে। ১২ লাখ ৪৮ হাজার লুজ শিটের পরিবর্তে মজুদে আছে সাড়ে ৮ লাখ।
ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপসংহার
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে ফলাফল জালিয়াতির ঘটনা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে বড় একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। দুদকের অভিযান বোর্ডে গোপন অনিয়মগুলো উদঘাটনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই ধরনের তদন্তের মাধ্যমে বোর্ডের জবাবদিহিতা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ও ন্যায্য ফলাফল নিশ্চিত হবে।
