রাজধানীর অন্যতম নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে গত কয়েকদিন ধরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাজনৈতিক কমিটি বিলুপ্তি ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খানের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন এবং একজন আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়োগ দিতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পানির ফিল্টার, জেনারেটর, ইলেকট্রিসিটি ফি, ল্যাব ফি ও প্র্যাকটিক্যাল ফি বাবদ টাকা নিলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। শিক্ষার্থীরা বলছেন, টাকা নেওয়া হলেও পানির ফিল্টার কেনা হয়নি এবং নানা খাতে অতিরিক্ত ফি আরোপ করা হচ্ছে, যা নিয়ে তাদের ক্ষোভ বাড়ছে।
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেন। একই সঙ্গে তারা প্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির কাছেও যান। আন্দোলনের পর অধ্যক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে পদত্যাগের আশ্বাস দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকদের যোগসাজশের কারণে এ প্রতিশ্রুতি কার্যকর হচ্ছে না।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খান আমাদেরকে বলেন, “সরেজমিনে এসে দেখে যান। শিক্ষার্থীদের কী অভিযোগ আমি জানি না।” রাজনৈতিক কমিটি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “এটা তো আমি দেই না, এটা সরকার দেয়। আমার হাতে নেই।”
তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না বরং সুষ্ঠুভাবেই চলছে। তার বক্তব্য, “শিক্ষার্থীদের দাবি মানলেই কি হবে? আমরা সবাই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেবো? এটাতো একটা সিস্টেম আছে।” তিনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা বোর্ড বা অ্যাডহক কমিটির কাছে যাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। তার মতে, “একজন প্রিন্সিপাল পদত্যাগ করতে বললেই কি পদত্যাগ করতে হবে? এরও তো একটি প্রক্রিয়া আছে।”
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইয়ামিন উজ্জমান দৈনিক আমাদের বার্তাকে জানান, প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদত্যাগে সম্মত হলেও কমিটি ও সুবিধাভোগী কিছু শিক্ষকের হস্তক্ষেপে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষক এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক কমিটির বিলুপ্তির দাবিতে শিক্ষাবোর্ডের বিভাগীয় কমিশনার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দেন। প্রায় ১৩০ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরসহ এ আবেদন জমা দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন।
সর্বশেষ ১৩ সেপ্টেম্বর গভর্নিং বডির মতবিনিময় সভায় সভাপতি এবিএম আব্দুস সাত্তার ঘোষণা দেন, আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যে শিক্ষকরা আন্দোলন সমর্থন করেছেন তাদের কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হবে।
সভাপতির এমন মন্তব্যে শিক্ষার্থীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, অবিলম্বে রাজনৈতিক কমিটি বিলুপ্ত করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে এবং এর পরিবর্তে ডেপুটেশনে একজন আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়োগ দিতে হবে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, তাদের এই আন্দোলন সবার কল্যাণের জন্য এবং ক্যাম্পাসকে রাজনীতি মুক্ত করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। বর্তমানে একজন ব্যক্তিত্বহীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আছেন, যিনি একটি অযোগ্য রাজনৈতিক কমিটির ইশারায় পরিচালিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানে আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়োগের দাবি নতুন নয়। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেনের পদত্যাগ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল “ডেপুটেশনে আর্মি প্রিন্সিপাল চাই”।
পরবর্তীতে, ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খান দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষকদের প্রথম সাধারণ সভায় প্রতিশ্রুতি দেন—তিন মাসের মধ্যেই একজন যোগ্য ও নিষ্ঠাবান আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়ে আসা হবে। তবে বাস্তবে দীর্ঘ দুই বছর আট মাস অতিক্রম করলেও তিনি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের পুনরায় দাবির মুখে তিনি বাধ্য হয়ে ১৪ আগস্ট ঢাকা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আর্মি প্রিন্সিপালের জন্য আবেদন করেন। তখনও তিনি ১৫ দিনের মধ্যে এ নিয়োগ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ’s)
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে অসন্তোষের মূল কারণ কী?
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন রাজনৈতিক কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অযোগ্যতার কারণে প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা কেন অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করছেন?
তাদের দাবি, অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা ফি নিলেও কার্যকর কোনো কাজ করছেন না এবং রাজনৈতিক কমিটির প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
অ্যাডহক কমিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কী?
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা উচিত, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।
আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়োগের দাবি কেন উঠেছে?
শিক্ষার্থীদের মতে, একজন আর্মি প্রিন্সিপাল প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবেন।
অধ্যক্ষ আ. ন. ম. শামসুল আলম খানের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আছে?
অভিযোগ রয়েছে তিনি পানির ফিল্টার, জেনারেটর ও ল্যাব ফি বাবদ টাকা নিলেও সেগুলোর সঠিক ব্যবহার করেননি।
আন্দোলনে কতজন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন?
খবরে জানা গেছে, প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
গভর্নিং বডির ভূমিকা কী ছিলো?
সভাপতি এবিএম আব্দুস সাত্তার ঘোষণা দেন, আন্দোলনে জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও উদ্বেগ তৈরি করে।
উপসংহার
উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাম্প্রতিক অসন্তোষের পেছনে মূলত রাজনৈতিক কমিটির প্রভাব, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অযোগ্যতার অভিযোগ, এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আর্মি প্রিন্সিপাল নিয়োগের দাবি জড়িত। একদিকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিভেদ, অন্যদিকে গভর্নিং বডির কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
